রবিবার ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১২:৩১
রোজাদারদের জন্য আয়াতুল্লাহ কাশ্মিরী (রহ.)-এর ৯টি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক উপদেশ

বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, আধ্যাতিক ও নৈতিক শিক্ষার উস্তাদ মরহুম আয়াতুল্লাহ কাশ্মিরী (রহ.) রমজান মাসকে আত্মগঠন, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার এবং গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জনের এক মূল্যবান সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তার প্রদত্ত ৯টি উপদেশ রোজাদারদের জন্য পথনির্দেশক হতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ কাশ্মিরী (রহ.)-এর উপদেশসমূহের সংক্ষিপ্ত তালিকা:

১. রোজা অবস্থায় কিছু সময় চিন্তা-গবেষণায় (তাফাক্কুর) ব্যয় করুন,

২. প্রতিদিন একটি দীর্ঘ সিজদা করুন

৩. রোজা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য রাখুন এবং গুণগত মানের দিকে লক্ষ্য রাখুন,

৪. নিজ বাড়িতে ইফতার করুন এবং ইফতারের সময় দলিল করুন (আল্লাহর কাছে নাজ-নেয়াম করুন),

৫. রমজানে সবসময় সদাচরণ ও উত্তম আখলাক বজায় রাখুন,

৬. অশ্রু ও ক্রন্দনের মাধ্যমে রমজানের নৌকা চলতে দিন,

৭. রমজানে আপনার লক্ষ্য হতে পারে লাইলাতুল কদর,

৮. প্রতিদিন একটি আয়াত নির্বাচন করে তা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা সহকারে তিলাওয়াত করুন,

৯. পূর্ণমানব ও ইমাম মাহদী (আ.ফা.) প্রতি আপনার সংযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হতে দেবেন না!

উপদেশসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. চিন্তা-গবেষণা (তাফাক্কুর): রোজার রহস্যময় মুহূর্তগুলোর কিছু সময় সর্বোত্তম ইবাদত তথা “চিন্তা” করতে ব্যয় করুন। নিজের ও আল্লাহর সঙ্গে নির্জনতা পালন করুন। বিশেষভাবে আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কের ধরন নিয়ে ভাবুন। আশা করা যায়, এ চিন্তা আপনার জন্য আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করবে।

২. দীর্ঘ সিজদা: রমজান মাসে ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থাগুলোর একটি হলো “দীর্ঘ সিজদা”, যা নবী করিম (সা.)-এর জোরালো সুপারিশ। দীর্ঘ সিজদার সময় বান্দার ওপর রহমতের বৃষ্টিধারা ও অসংখ্য বরকত নাজিল হয়। প্রতিদিন অন্তত একটি দীর্ঘ সিজদা করার চেষ্টা করুন।

৩. শুধু আল্লাহর জন্য রোজা রাখা (লিল্লাহ): রমজানের শুরুতে নিয়ত করুন যে আপনি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখবেন। রোজার আদব-কায়দা যথাসাধ্য পালন করুন। পরিমাণের দিকে নয়, বরং গুণগত মানের দিকে বেশি লক্ষ্য রাখুন। বেশি বেশি আয়াত ও দোয়া পড়ার পেছনে না ছুটে সেগুলো হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। অল্প খাবারও ভালোভাবে চিবিয়ে খান, যাতে তা আপনার জীবনের অংশ হয়ে যায়। ধর্ম ও শরিয়তকে আক্ষরিক দৃষ্টিতে দেখা আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা।

৪. নিজ বাড়িতে ইফতার ও দলিল করা: যথাসম্ভব নিজের বাড়ির দস্তরখানায় ইফতার করুন, এমনকি মসজিদেও ইফতার না করাই ভালো। ইফতারের বরকত ও ইফতারের মুহূর্তের কবুল দোয়া যেন আপনার পরিবার ও বাড়িতে নাজিল হয়।

দলিল কী? দোয়ায়ে ইফতিতাহ-তে আমরা বলি: "مدلاً علیک" (আপনার কাছে নাজ-নেয়াম করছি)। ‘দলিল’ মানে হলো নাজ-নেয়াম করা বা আবদার করা।

ইফতারের সময় আল্লাহর কাছে নাজ-নেয়াম করুন, কারণ আপনি তাঁরই জন্য রোজা রেখেছেন এবং তিনি দয়া ও করুণার দস্তরখান বিছিয়েছেন। প্রথম লোকমাটি মুখের কাছে নিয়ে যান, কিন্তু না খেয়ে দোয়া করুন। অর্থাৎ, আপনি আল্লাহকে বলছেন, 'হে আল্লাহ, যদি আমার প্রয়োজন পূরণ করেন, তাহলে ইফতার করব'। এই অবস্থাকে ‘দলিল’ বলে। এটি অলৌকিকভাবে কাজ করে।

৫. সদাচরণ (হুসনে খুলুক): রমজানের মেহমানদারিতে টিকে থাকার রহস্য হলো “সদাচরণ”। সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সদাচরণ ও দয়ার আচরণ করুন। সবসময়, বিশেষ করে এই মাসে, ভালো ব্যবহার করুন। যখনই রাগান্বিত হবেন, তখনই মনে করবেন যে আপনি আল্লাহর এই মেহমানদানি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

৬. অশ্রু ও ক্রন্দন: রমজানের কল্পিত নৌকা “অশ্রুর” ঢেউয়ে ভেসে মুক্তির তীরে পৌঁছায়। এই মাসে, বিশেষ করে রহস্যময় সেহরির মুহূর্তগুলোতে, আল্লাহর কাছে অশ্রু ও ক্রন্দন প্রার্থনা করুন। অবশ্যই সেহরিতে জাগরণ ও অশ্রু ঝরানোর শর্ত হলো ভগ্নহৃদয় হওয়া— নিজেকে ছোট ও বিনয়ী মনে করা।

৭. লক্ষ্য হোক লাইলাতুল কদর: রমজানের শুরু থেকেই আপনার লক্ষ্য হতে পারে “লাইলাতুল কদর”, যা রমজানের প্রাণস্বরূপ। শুধু এটা নিয়ে ভাববেন না যে লাইলাতুল কদর কোন রাতে; বরং চেষ্টা করুন লাইলাতুল কদর যেন আপনার মাঝেই ঘটে, আপনার অন্তরে প্রভাব ফেলে।

৮. কুরআন নিয়ে চিন্তা করা: রমজান আমাদের কুরআনের বসন্তকাল। এই কুরআনি বসন্তে প্রতিদিন একটি আয়াত নির্বাচন করুন এবং ইফতার পর্যন্ত বারবার তা তিলাওয়াত করুন এবং এর মর্ম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন। আশা করা যায়, ইফতারের সময় সেই আয়াতটি আপনার কাছে তার রহস্য উন্মোচন করবে।

৯. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সঙ্গে সংযোগ:

بِالْإِمَامِ تَتِمُّ الصَّلَاةُ وَ الصِّيَام

নামাজ ও রোজা ইমামের উসিলার মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়। সারা রমজান মাসে আপনার দৃষ্টি যেন প্রকৃত রোজাদার ও পূর্ণমানব তথা ইমাম মাহদী (আ.ফা.) থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। আপনার রোজা, নামাজ ও সকল ইবাদত তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha